জাতীয়

ড. আলম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একজন সফল সম্পাদক: ড.এ কে এনামুল হক

অধ্যাপক শামসুল আলম পরিকল্পনা কমিশনের একটি পরিচিত মুখ। তবে তাঁকে তাঁর বাইরেও পাবেন। তাকে পাবেন পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের টক শোতে। তাঁর কাজ একটি দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কেউ কোনো উপাত্তকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তাকে শুধরে দিতকুণ্ঠিত বোধ করেন না। বহুবার দেখছি তাকে কাজটি করতে। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় অত্যন্ত সীমিত সময়ের। পরিকল্পনা কমিশনের কাজে অনেক সময় নানা গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। যখনই পরিবেশ বা জলবায়ুসম্পর্কিত কোনো অর্থনৈতিক আলোচনার প্রয়োজন পড়ত, তিনি ডাকতেন। আমি নিজে খুব একটা সামাজিক মানুষ না (এই অর্থে যে কাজের বাইরে যোগাযোগ রাখার অভ্যাস আমার কম)। তাই কিছুটা অবাক হতাম যখনই ডাকতেন। কারণ তাকে আমি কখনই বলিনি যে, আমাকে কোনো কাজ দিন। কিংবা এই কমিটিতে আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাই। তাই তার ডাকে ভরসা পেতাম যে কমিশন অন্তত পরিচিত মুখের সমাবেশই নয়, প্রয়োজনে তারা বিশেষজ্ঞ মতামতের জন্য পরিচিত গÐির বাইরেও যান। অন্তত তা-ই আমি পেয়েছি ড. শামসুল আলমের কাছে। মনে মনে তাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়েছে।

একবার কোনো এক সেমিনারে তার সাথে দেখা। বললেন কী খবর? কেমন আছেন? ভালো। আরে আপনার লেখা দেখি না কেন? কিছুটা অবাক। বললাম আমার লেখার গুরুত্বই বা কতটুকু। তাই সব সময় লিখি না। মাঝে মাঝে লিখি। তাও করি অনেক ভ্রান্ত ধারণা শুধরে দেওয়ার জন্য। আপনি আমার লেখা খঁজবেন ভাবিনি। হেসে বললেন, আরে দেখেন বহুলোকই ত লিখেন কিন্তু খুব কম লোকের কাছে যুক্তিসংগত মতামত পাই। তার ওপর নতুন কিছু পাওয়া যায় না বললেই চলে। তাই কোনো কোনো লেখা খুঁজি। আপনার লেখায় নতুন চিন্তা থাকে। লেখুন। দেশের কাজে লাগে। তার কথায় কিছুটা অনুপ্রেরণা পেলাম।

পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চলছিল বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই। প্রতিটি পরিকল্পনায় প্রচুর গালগল্প থাকে। কীভাবে তা তৈরি হয় তা নিয়ে কৌত‚হল ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বিশ্বব্যাংকের প্ররোচনায় তা বন্ধ হয়ে গেল। এল দারিদ্র্য বিমোচন পরিকল্পনা। বর্তমান সরকার আসার পর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আবার চালু হলো। তবে এবারই প্রথমবারের মতো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার গল্পের পেছনের গল্প দেখতে পেলাম। ড. শামসুল আলমের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রকাশনা। তিনিই সম্ভবত প্রথম পরিকল্পনাবিদ যিনি পরিকল্পনার ধারাবাহিক গল্প প্রকাশ করতে শুরু করেন। একটি পরিকল্পনার পেছনে অনেক কাজ থাকে। অনেকে কাজ করেন কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত বস্তাবন্দি রিপোর্ট আকারে পড়ে থাকে। তাকে শ্রদ্ধা করি, কারণ তিনি প্রতিটি পরিকল্পনার পেছনের কাজগুলোকে প্রকাশ করেছেন। তার প্রকাশনাগুলো ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে থেকে যাবে। এসব দলিল তিনি লিখেননি, তবে সম্পাদনা করেছেন, প্রকাশ করেছেন-দেশের জন্য, জাতির জন্য ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। আবার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন দলিলের বাংলাভাষ্য বের করেছেন। দলিল প্রকাশনা সহজ কাজ নয়। অনেকে সাহসী হতে চান না। অনেকে অন্যকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠাবাধ করেন। তদুপরি রয়েছে বাড়তি সতর্কতা। বিশেষজ্ঞরা কোথাও যদি এমন কিছু লিখে থাকেন যাতে সরকার বিব্রত হবে তার দায় তাকেই নিতে হবে। তাই প্রকাশের আগে বাড়তি খাটুনি করতে হয়। এই শেষ কাজটি আমরা অনেকে করি না। যা করে থাকে সকল সফল সম্পাদক। ড. শামসুল আলম তা-ই করেছেন। কষ্ট করে পরিকল্পনা কমিশনের কাজের পেছনের গল্প প্রকাশ করেছেন। যতেœর সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন। উদ্যোগ নিয়েছেন। এই ব্যতিক্রমী কাজের জন্য তাকে আমি স্মরণে রাখব কারণ তার এই প্রকাশনাগুলো আমাদের কাছে থাকবে ইতিহাস হয়ে। তথ্যভিত্তিক সময়ের সাক্ষী হিসেবে।

লেখক: ড. এ কে এনামুল হক, অধ্যাপক, আর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button