জাতীয়

ড. শামসুল আলম উন্নয়ন স্বপ্নচারী এক পরিকল্পনাবিদ : ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

তার কাজের মধ্য দিয়েই তিনি পরিচিত। এ দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যমণি হয়ে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি কাজ করে চলেছেন। অবিরাম দেশ ভাবনায় বিভোর এক নিরন্তর পথের যাত্রী তিনি। বড় স্বপ্নকে ধারণ করলে তবে এ রকমটি করা সম্ভব। বহুদিন কেমন যেন বেশ নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছিল আমাদের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগটি। স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত কৃষি অর্থনীতির এক শিক্ষকের হাতে সে বিভাগটির অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। বলছি সরকারের বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম মোহনের কথা।

আগে থেকেই দেশ নিয়ে, দেশের উন্নয়ন আর অর্থনীতি নিয়ে তিনি পত্রপত্রিকায় লিখতে শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশটাকে দেখেছেন অতি গভীর আর নিবিড়ভাবে। দরিদ্র একটি দেশের পরিকল্পনা করতে গিয়ে গভীর সেসব পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। কৃষি অর্থনীতির শিক্ষক শুধু কৃষি নিয়েই আবদ্ধ থাকেননি, বৃহত্তর অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়েই বরাবর ভেবেছেন তিনি। সে কারণেই বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষত্রে অসামান্য সব পরিকল্পনার দলিল তিনি একর পর এক প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। দেশের হয়ে তিন তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের (২০১১-২০১৫-২০১৬-২০২০ এবং ২০২১-২০২৫) দায়িত্ব পালন র্কও সৌভাগ্য অনুমান করি আর কোনো পরিকল্পনাবিদেরই হয়নি এবং আর কোনকালে হবে কে জানে। কেবল প্রথামাফিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, মানে গুণে তত্ত¡ ও তথ্যভিওিক এসব পরিকল্পনা অত্যন্ত মুল্যবান দলিল এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার মুল্যবান নির্দেশক হিসেবে কাজ করছে। একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনার প্রতিফলন উঠে এসেছে এসবের মধ্য দিয়ে। গভীর ভাবনা এবং গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এই কৃষি অর্থনীতিবিদ এরকম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন।

কেবল তো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নই নয়, এই কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক উভয় মাধ্যমেই বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁর বক্তব্য ও মতামত প্রকাশ করেছেন অকপটে প্রতিনিয়ত। উন্নয়ন অর্থনীতি ভাবনার সঙ্গে সুধীজনের সম্পৃক্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানা রকম প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। প্রকাশ করেছেন এসব নিয়ে অনেকগুলো আর্টিকেল এবং গ্রন্থও। তাঁর কার্যকালীন সময়ে অন্যান্য গ্রন্থের পাশাপাশি তিনি সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনবিষয়ক ১৫টি গ্রন্থও রচনা করেছেন। নানাভাবে তাঁর কর্ম আর ভাবনাকে তিনি সকল স্তরের মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সকল মাধ্যমেই তিনি দেশ ও উন্নয়ন ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তাঁরই হাত ধরে সংশোধিত ও পনুবিন্যস্ত দ্বিতীয় দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্র (২০০৯-২০১১), বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১) এবং প্রথম বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০১১-২০২১) প্রণিত হয়েছে।

‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ তাঁর এক বিশাল ও বিস্তৃত কর্মকান্ডের ফল। আমাদের এই বদ্বীপকে কেন্দ্র করে শতবর্ষের উন্নয়ন ভাবনার এক অতি মূল্যবান পরিকল্পনা এটি। বাংলা বদ্বীপজুড়ে পানি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার এক দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত পরিকল্পনা হলো ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’। এতে ড. শামসুল আলম দুটি খন্ডে যে কৌশল ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং এদের বাস্তবায়ন ও কর্ম রূপরেখা দাঁড় করিয়েছেন সেটি এক কথায় অনবদ্য। তাঁর বদ্বীপ পরিকল্পনার প্রথম খÐটি তো এ দেশের পানি ও ভূমি-সম্পর্কিত নানা তথ্য-উপাত্তের একটি সমৃদ্ধ জ্ঞানকোষের মতো। এটি পানি ও ভূমিবিষয়ক যেকোনো প্রকার অধ্যয়ন ও গবেষণার একটি চমৎকার রেফারেন্স বুক হিসেবে ব্যবহার হবে তাতে আমি নিঃসন্দেহ। বাংলাদেশকে একটি উচ্চতর মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করার সরকারের যে অঙ্গীকার ও অভিপ্রায় সেসব ধারণ করেই এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি বাস্তবেই অত্যন্ত বড় মাপের ও দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা। ড. আলম এবং তাঁর টিমকে সেজন্য আন্তরিক মোবারকবাদ।

একজন কৃষিবিদের ভাবনা কেবল কৃষিকে নিয়ে আবর্তিত হতে হবে তেমন কোনো কথা নয়, কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের কৃষিসহ সমগ্র ক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলে তবেই দেশটির যথার্থ উন্নয়ন হবে, সে ভাবনাও যে কৃষিবিদগণ ভাবেন ড. আলমের কর্মজীবন এবং তাঁর প্রয়াস সে সাক্ষ্য বহন করে কর্মের সুযোগ পেলে, কর্মটাকে নেশার মতো মনে করলে ও দেশ ভাবনা যদি মাথার ভেতর অনুক্ষণ কাজ করে তবেই একজন দেশপ্রেমিক মানুষের হাত ধরে এ রকম বড় কাজ সম্পন্ন হতে পারে। এটি তাঁর গভীর দেশপ্রেমেরও একটি উদাহরণ বটে। আমি তাঁর দীর্ঘ, উৎপাদনক্ষম ও কর্মকাÐময় জীবন কামনা করি।

লেখক: ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূইয়া
ভাইস চ্যান্সেলর, শের ই বাংলা কষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
সভাপতি, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি), ঢাকা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button