জাতীয়

বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে সম্মানজনক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেঃ পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী

ফারুক হোসেন:
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডক্টর শামসুল আলম বলেন ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে সম্মানজনক দেশ ও রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরেই বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখন আমরা সেই তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এসে পৌঁছেছি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি ও ভৌত অবকাঠামো ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমডিজি বাস্তবায়নেও আমরা সাফল্য দেখিয়েছি। তবে যে বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে তা হলো, টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ কর্তৃক এসডিজি’র অগ্রগতি অর্জনে পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করেছেন। এ পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল হয়েছে।

বুধবার ২৯ সেপ্টেম্বর আগারগাঁও বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিবিএস পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, দুযোর্গ পরিসংখ্যা শক্তিশালী করণ (ইসিডিএস) প্রকল্প এবং ইউএন ওমেন কর্তৃক যৌথ আয়োজিত ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ফর জেনারেটিং জেন্ডার রেসপনসিভ এনভারমেন্ট ডাটা ইন ফোকাসিং টু এসডিজিএস শীর্ষক ০৩ (তিন) দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন।

সমাপনী অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সচিব মো. ইয়ামিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, পরিবেশ অধিদপ্তর, মহাপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন, ইউএন ওমেন প্রতিনিধি দিলরুবা হায়দার, বিবিএস প্রকল্প মহাপরিচালক তাজুল ইসলাম প্রমুখ।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন বাংলাদেশে অপরিকল্পিত শিল্প কারখানার উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্টিকরণে আমাদের কেবল হতাশই করে। টেকসই উন্নয়ন বলতে ওই সকল উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডকে বোঝায়, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও নিশ্চিত হয়; একইসঙ্গে প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রেও (ইকোসিস্টেম) তা কোনো ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলে না। অপরিকল্পিতভাবে যত্র-তত্র শিল্প কারখানা স্থাপন পরিবেশ পরিস্থিতিকে ভয়ানক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের শিল্প কারখানার কতিপয় ব্যবসায়ীর বেশি লাভের আশায় ইটিপি ব্যবহার না করে তাদের শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য সরাসরি নদী-নালা খাল-বিলে নিক্ষেপ করছেন। এতে দূষিত হচ্ছে পানি। ধ্বংস হচ্ছে মাছ, জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদ। এ দূষিত পানিই আবার চুইয়ে যাচ্ছে কৃষি জমিতে। এ কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নগরগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় জলাবদ্ধতা। তাদের কৃতকর্মের জন্য যে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে একথা তারা বিশ্বাস করেন না এবং ভুলেও স্বীকার করেন না। এজন্য সকলকেই দায়িত্ব নিয়ে সচেতন হতে হবে এবং নিজের বাঁচার জন্য হলেও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

পৃথিবীর কোনো দেশই পরিবেশকে প্রাধান্য না দিয়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেনি। উন্নয়ন ও পরিবেশের সুরক্ষা কখনোই সাংঘর্ষিক নয়, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই উন্নয়ন করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। আমাদেরও উচিত পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার হ্রাস করে নবায়নযোগ্য সবুজ শক্তি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানি বৈচিত্র্যের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও সহায়তা করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

পরিবেশ দূষণের ফলে মানুষ, জীবজন্তু ও বাস্তুসংস্থানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রকম জটিল রোগ-ব্যাধিতে। জীবজন্তুর বাসস্থান বিনষ্ট হচ্ছে। খাদ্য শৃঙ্খল ধ্বংস হচ্ছে। অনেক প্রাণী প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হিমবাহ গলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ঝড়, জলোচ্ছ¡াস ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অসময়ে বন্যা ও বৃষ্টির কারণে বিল ও হাওর অঞ্চলের ফসল বিনষ্ট হচ্ছে। নদীভাঙনের ফলে অনেক ফসলী জমি ও জনপদ ধ্বংস হচ্ছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০০৯ সালে Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan (BCCSAP) প্রণয়ন করে। এই পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য দেশের সামর্থ ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এখানে ঘন ঘন দুর্যোগের ফলে যত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্য কোথাও এতটা হয়না। আমাদের অভিযোজন  (Adaptation) সক্ষমতায় আরো কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশের মত ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর জন্য খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ২০১৫ সালে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ হিসেবে স্বীকৃতি পান বা বিশ্বনেতাদের মধ্যে অন্যতম স্থানে থাকেন, তখন সবার দৃষ্টি পড়ে এই দেশটির ওপর।

পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা, আইনী কাঠামো নিয়ে ২০১০ সাল থেকে নেওয়া তার পদক্ষেপগুলো তাত্তি¡ক কাঠামোতে স্থান পায়। পরিবেশ আদালত আইন-২০১০; বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২; ইটভাটা ও এর স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ আইন- ২০১৩ ; জীববৈচিত্র্য রক্ষা আইন-২০১৭; জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তহবিল গঠন, এমনি বহুবিদ গুরুত্বপূর্ণ দলিল স্থান পায় পরিবেশ রক্ষায় সরকার প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইতোমধ্যে আমাদের কার্যকর ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিতও হয়েছে।

বিবিএস বর্তমানে নতুন নতুন বিষয়ে পরিসংখ্যান প্রণয়ন করছে এবং স্টেকহোল্ডারদের মতামত সহ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিসংখ্যান প্রণয়ন করার চেষ্টা করছে যা ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। পরিবেশগত ফ্রেমওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করেই ইসিডিএস প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য দুর্যোগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button